দেবী- রিভিউ

পরিচালক যখন ‘আয়নাবাজি’র চিত্রনাট্য লেখা অনম বিশ্বাস আর প্রধান(!) চরিত্র যখন মিসির আলি এবং সেই চরিত্রে অভিনয় করছে চঞ্চল চৌধুরী, তখন ‘দেবী’ দেখার জন্য অধীর আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। আমি এখনও চঞ্চলের একটা বাজে সিনেমা দেখিনি।

স্টার সিনেপ্লেক্সে সন্ধ্যা সাতটা চল্লিশের শো, হাউসফুল। খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। গল্পটা আমাদের প্রায় সবার জানা। কিন্তু গল্পটা কতটা অনম বিশ্বাস দেখেছেন আর সেটা আমাদের দেখাতে পেরেছেন সেটাই হলো দেখার বিষয়।

‘দেবী’র পটভূমি বইতে সেই আশির দশকের। বইয়ের দেবীকে ভুলে গিয়ে অনম বিশ্বাসের দেবী দেখতে যাওয়াই শ্রেয়। পটভূমি আর চরিত্র খানিক বদলে মূল গল্পটা ধরে রেখে নিজের মত করে দেবীকে সাজিয়েছেন অনম বিশ্বাস। কিন্তু চরিত্রের চিত্রায়নে অনেক ছেঁড়া সুতোর টান। কেন জানি মনে হয় অনম বিশ্বাস থ্রিলার আর হরর গল্পের পার্থক্যটা ভুলে গেছেন। আবার এমনও হতে পারে তিনি চেয়েছেনই থ্রিলার আর ভূতের গল্পের একটা মিশেল তৈরী করতে।

প্রথমে দর্শনধারী তারপর গুন বিচারী একটা কথা আছে, সেই হিসেবে প্রথম দর্শনে মিসির আলি পারফেক্ট তার প্রথম কিস্তিতে। কিন্তু ‘আমার কল্পনার’ মিসির আলি একজন স্বল্পভাষী মানুষ। হা-হু তে জবাব দেন। কিন্তু যখন কথা বলেন প্রত্যেকটি কথা প্রচণ্ড ভারী। সেখানে তার হা-হু এর ওজনও অনেক। কিন্তু অনম বিশ্বাসের মিসির আলি বেশ মোটেও কম কথার মানুষ না। ওদিকে চঞ্চল চৌধুরী খুব চেষ্টা করেছেন হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি হয়ে যেতে। কিন্তু হয়ে গেছেন অনম বিশ্বাসের মিসির আলি। আমি তাতে কোন ভুল দেখছি না। অনেক এডাপ্টেশনের চরিত্র শেষ পর্যন্ত মূল বইয়ের চরিত্রকে ছাপিয়ে পরিচালকের হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মিসির আলি প্রথম বার তো বই কে ছাপিয়ে যেতে পারলেন না, দেখা যাক পরেরবার কি হয় (যেহেতু দেবী’র গল্প শেষ হয় গিয়ে নিশিথীনি’তে)। চঞ্চলকে মিসির আলি চরিত্রে পর্দায় দেখার সময় আমি কেন জানি হুমায়ূন ফরীদিকে খুব মিস করছিলাম।

গল্পটা মিসির আলি সিরিজের হলেও ‘দেবী’ গল্পটা তো রানুর। রানু চরিত্রে জয়া আহসান বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। তবে আমার মনে হয়, আরো অনেক ভালো করা যেত। দেখতে বয়স যাই লাগুক, অভিনয়ে সেই বয়সটাকে ছাব্বিশে নামিয়ে আনা খুব কঠিন। আর সেই কঠিন পরীক্ষায় জয়া আহসান পাশ করলেও নম্বর ভালো না। আমার কাছে মনে হয়েছে, তিশা এই চরিত্রে এই সময়ে সবচে পারফেক্ট হতো।

নিলু চরিত্রটা বেশ ভালো ভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন শবনম ফারিয়া। শবনম ফারিয়া খুব ভালো পরিচালক পেলে এর চেয়েও ভালো অভিনয় করবে বলে আমার মনে হয়।
‘দেবী’ এবং ‘নিশিথীনি’ মিলিয়ে যে গল্পটা দাঁড়ায়, সেই গল্পের প্রধান চরিত্র নিলু। এমনকি মিসির আলির চাইতেও। যেহেতু সিনেমার নামের সাথে ট্যাগ জুড়ে দেয়া হয়েছে ‘মিসির আলি প্রথমবার’ সেহেতু ধরে নেয়া যায় পরিচালক ও প্রযোজক মশাই দ্বিতীয় কিস্তির পরিকল্পনা ফেঁদে বসেছেন। জয়া আহসানকে দিয়ে নাহয় ‘প্রথমবার’ পার পেয়ে গেলেন, দ্বিতীয় কিস্তি কি শবনম ফারিয়াকে দিয়ে পার করাতে পারবেন? ভাবুন পরিচালক মশাই, ভাবুন।

ইরেশ জাকেরের স্ক্রিনটাইম অনেক কম হলেও অভিনয় করেছেন দারুণ। তাকে আরও স্ক্রিন টাইম দিয়ে চরিত্রটা আরো ভালো করে দাঁড় করানো যেত। তাতে থ্রিল আরো বাড়তো বলে আমার মত। আনিস চরিত্রে অনিমেষ আইচের অভিনয় ভালো লাগে নি।

অনম বিশ্বাসের সিনেমা পরিচালনায় হাতেখড়ি হলেও নাটক সে আগে বানিয়েছেন। কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালনায় তিনি খুব মুন্সিয়ানা কি দেখাতে পেরেছেন?
চঞ্চলের এতো চেষ্টার পরেও মিসির আলি হয়ে উঠতে না পারার পেছনে আমি মনে করি পরিচালক মশাই-ই দায়ী। সে চেয়েছে মিসির আলিকে তার চরিত্র হিসেবে পর্দায় তুলে আনতে। অবশ্য এই সাহসটুকুই এই সময়ে আমাদের দেশে ক’জনের আছে? এছাড়া রানুর চরিত্রটা তো অনেকখানি ‘বারফি’র প্রিয়াংকা চোপড়ার চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে হয়েছে। ওদিকে নিলু চরিত্রে শবনম ফারিয়া চমকে ওঠার দৃশ্যে, কষ্টের দৃশ্যে, খুশির দৃশ্যে একই এক্সপ্রেশন দিচ্ছে। আরেকটু যত্ন নিয়ে কাজ করলে শবনম ফারিয়াকে দিয়ে আরো ভালো অভিনয় বের করা যেত। শুভঙ্করের ফাঁকি আছে শট কন্টিনিউইটি আর টাইম কন্টিনিউইটিতেও। সম্পাদনা করিয়েছে ভারত থেকে সাহেব বিবি গোলাম, সিনেমাওয়ালা, মাছের ঝোল, বাস্তু সাপ এডিট করা শুভজিৎ সিংহ কে এনে। তার ওপারের সিনেমার তুলনায় তিনি তো দেবীকে বিসর্জন দিয়ে দিয়েছেন। তার সাথে হাত মিলিয়েছেন পোষাক পরিকল্পনার আনিকা জাহিন। রানুর প্রত্যেকটা শাড়ি পাট ভাঙা নতুন। ১৩ মাসের সংসারে সে এখনো প্রতিদিন নতুন শাড়ি পড়ে? আর আনিসের পেশা আর আয় সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা না পেলেও এটুকু বোঝা যায় যে সে আহামরি কিছু আয় করে না। কিন্তু তার স্ত্রী বেশ দামী শাড়িই পরছে প্রতিদিন। নিলু যেদিন তার বন্ধুর সাথে প্রথম দেখা করতে যায় রানুকে নিয়ে সেদিন রানুর সাজগোজ এতো বেশি কেন? আর নিলু তো মনে হয় লিপস্টিকও ব্যবহার করেনি। উল্টোটা হওয়ার কথা ছিলো না?

একই ভাবে সংলাপ এতো সাদামাটা যে, মনে রাখার মত বা আরেকবার শোনার মত একটা সংলাপও পাইনি। মিসির আলিকে দিয়ে এতো কথা না বলিয়ে অল্প কয়েকটা সুন্দর কথা বলালেই মিসির আলি চরিত্র আর ‘দেবী’ সিনেমা দুটোই লেটার মার্কে পাশ করে যেত।

এই সিনেমার সবচে শক্তিশালী অংশ এর আবহ সংগীত আর শব্দের কাজ। এতো ভালো শব্দ আর আবহ সংগীত এ যুগের বাংলা সিনেমায় নেই বললেই চলে। সাউন্ড ডিজাইনারের একটা পরিচয় দিলেই চলবে। তিনি কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘শব্দ’ সিনেমার সাউন্ড ডিজাইনার, নাম অনির্বান সেনগুপ্ত। ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর সাউন্ডের কাজও তার করা।
আলোর কাজ নিয়ে পরিচালক মশাই ভালোই খেলা দেখিয়েছেন। তবে যারা হলিউডের ‘দ্য শাইনিং’ দেখেছেন, তাদের কাছে এই আলো আঁধারির খেলা একটু পরিচিতই লাগবে।

দশমীর দিনে মুক্তি পাওয়া ‘দেবী’র কি তাহলে বিসর্জনই হয়ে গেল? না, দেবী ভেসে আছে। হাবুডুবুও সে খাচ্ছে না। বঙ্গদেশে এযুগের থ্রিলারের পারদটা যখন অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ‘আয়নাবাজি’; তখন অনম বিশ্বাসের ‘দেবী’র ভাসতেই হয়। এ ‘দেবী’ হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে অনম বিশ্বাসের ‘দেবী।’ হুমায়ূন আহমেদের দেবী’কে মাথায় না রাখলে অনম বিশ্বাসের ‘দেবী’ গোল্ডেন এ প্লাস না পেলেও এ প্লাস পেয়েছে। সেই এ প্লাসও বেশ সাদামাটা।

*সম্পূর্ন ব্যক্তিগত মতামত। কারো ভিন্ন মত থাকতে পারে।

Tagged , , , ,