মহীনের ঘোড়াগুলি : উত্থান থেকে বর্তমান (পর্ব ১)

‘মহীনের ঘোড়াগুলি’- নামটা শুনে সেকেন্ডের ফ্র্যাকশনে চোখের দৃষ্টি খুঁজে বেড়ায় শব্দের উৎসকে, মুহূর্তেই কানে বেজে ওঠে গিটার-ট্যাম্বুরিন-বাঁশি আর স্যাক্সো-ড্রামের এক ঘোর লাগানো সংগীত! এ সেই ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’, কলকাতার প্রথম বাংলা স্বাধীন রক ব্যান্ড, যাদের ‘আরবান ফোক-রক’ গান সময়-স্থান পেরিয়ে বর্তমান মিলেনিয়ামের এক আশ্চর্য নিদর্শন হয়ে আছে সকল শ্রেণীর রক সংগীত ভক্তদের কাছে।

 

বাংলা গানেও যে ‘রক’ হতে পারে, এবং একই সাথে শব্দ-সুরের এক্সপেরিমেন্ট; সুররিয়াল অ্যাবসার্ড এই জাদুর পথিকৃৎ সাতজন ক্ষ্যাপাটে ‘সপ্তর্ষী’ তরুণ নিয়ে গড়া এই ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। তারা ছিলেন তাদের সময়ের চাইতে অগ্রবর্তী, তাই সমসাময়িকরা সে গানের মর্ম বোঝেনি, কিংবা বুঝতেও চায়নি। রেকর্ডগুলো পড়েছিল বাতিলের খাতায়, ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’কে চিনতে পারেনি কেউই।

 

কিন্তু এই ঘোড়ারা হারিয়ে যায়নি। কোন এক কার্তিকে বছর কুড়ি পর তারা ফিরেছিল। গানে-সুরে লুকিয়ে থাকা জীবন, প্রেম আর বিপ্লবকে হৃদয়ে ধারণ করতে এবার কারও দেরি হয়নি। সবার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্মের ‘সাইরেন অফ লাইফ’। কিংবদন্তী এই ব্যান্ডের ইতিহাস নিয়ে ফিরে দেখা তিন পর্বের এই সিরিজে। ইউটিউবের চাদরে মোড়া মহীনের ক্যাসেট আর লং প্লে’ রিওয়াইন্ড করে ফিরে যাওয়া যাক কিঞ্চিত সুখী পাখিদের সংবেগে ঠাসা ইতিহাসের পাতায়, যেখানে হয়েছিল সবকিছুর শুরুটা।

 

ব্যান্ডটা তখনও কাগজে-কলমে গড়ে ওঠেনি, গৌতম চট্টোপাধ্যায় ওরফে মণিদার ভাঙ্গা পায়ের প্লাস্টারে প্রতীকী হয়ে ছিল মহীনের আগমনী বার্তা। মহীনের বাকি অশ্বদের জন্য গৌতমের পায়ের প্লাস্টারটা ছিল হাজিরার ট্যালি, আবার একই সাথে তাদের এলোমেলো গানের খাতা। মহীনের পথচলার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে এই গৌতম ওরফে মণিদা’র প্রভাব, যাকে ধরা হত এই ব্যান্ডের ‘প্রাণ’! তাই শুরুতে তার গল্পটাও একটু বেশি।

 

গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ভাই প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় ওরফে বুলাদা, আর তাদের পিসতুতো ভাই রঞ্জন ঘোষাল- সাথে যোগ হলো তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে ভানু, তাপস দাস ওরফে বাপি, এব্রাহাম মজুমদার আর বিশ্বনাথ চট্ট্যোপাধ্যায় ওরফে বিশু। এই নিয়ে মহীনের সাত ঘোড়া। কলকাতা শহরতলীর মধ্যরাতের নিশুতি ভেঙ্গে ড্রামস-গিটারে তাদের দাপাদাপি শুরু হয়েছিল নাকতলার বেকার হাউজে। এক দিন নয়, দিনের পর দিন। ফলে ঘোড়াদের উৎপাতে কিঞ্চিৎ ‘বিরক্ত’ হয়েই এক প্রতিবেশী সেই বাড়ির পাঁচিলে আলকাতরা দিয়ে লিখে রেখে গিয়েছিলেন ‘আস্তাবল’। যে আস্তাবলের সন্ধান বছর পঁচিশেক আগেই পেয়েছিলেন কবি জীবনানন্দ দাস।

 

ব্যান্ডের ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ নামটি কবিরই ‘ঘোড়া’ নামের একটি কবিতা থেকে তুলে আনা। ১৯৪৮ এর কোন এক সময়, যখন কবি কোন এক নির্জন রাতে কলকাতার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে উচ্চারণ করেছিলেন,

‘আমরা যাইনি ম’রে আজো- তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়  

মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্না’র প্রান্তরে’

 

ঘোড়াগুলো নিঝঝুম কলকাতার অলি-গলি আর নিওলিথ মহেঞ্জোদারোর প্রান্তর ঘুরে কার্তিক মাসে এসে ধরা দিয়েছিল কবি জীবনানন্দের ঘোর লাগানো চোখে। অবশ্য জীবনানন্দ জানেননি, তার ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ আস্তাবল ছেড়ে এখন ইতিহাস হয়েছে।

 

‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গল্প করলে প্রথমে ফিরে যেতে হবে ষাটের দশকের শুরুতে- গৌতম আর প্রদীপের ঘরে। গৌতমরা ছিলেন পাঁচ ভাই। রক্তেই যেন গান মিশে ছিল গৌতমের, আর তার একদম বাধ্য অনুজ ছিলেন প্রদীপ ওরফে বুলাদা। তাদের বাবা ছিলেন বৈজ্ঞানিক, কিন্তু দারুণ সংগীতপ্রেমী। ঘরে তোলা ছিল সেতার, অর্গান, এস্রাজ, হারমোনিয়াম, ব্যাঞ্জো, ভায়োলিন, তবলার সমাহার, আর এদিকে গৌতম পারদর্শী একদম সবকিছুতেই! প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় নিজেই বলেছেন-

 

‘মণিদা সবই বাজাতে পারত। যে কোনও ইনস্ট্রুমেন্টই খুব সহজে বাজিয়ে ফেলত। তালিম ছাড়াই। নিজে নিজেই শিখে ফেলত বাজানোর আদবকায়দা।’

 

তবে গৌতম শুরুতে হাত পাকিয়েছিলেন তবলায়, বেনারসী ঘরানায়। মায়ের কাছে অন্যদিকে এস্রাজ শেখায় ব্যস্ত প্রদীপ। তবলার মৃদু বোল কিংবা দ্রুত লয়ের ঠেকে বেশ নাম-ডাকও কুড়িয়েছিলেন গৌতম। কিন্তু বেশিদিন ‘তবলচি’ হয়ে থাকতে চাননি স্বভাববিদ্রোহী গৌতম। তার অকাট্য অভিযোগ- যন্ত্রীদের যথার্থ সম্মানটা দেওয়া হয়না। গায়ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক সমান গুরুত্ব রাখেন যন্ত্রীরাও। ‘সঙ্গত’ শব্দটিতে ঘোর আপত্তি তার- এ যেন তাদেরকে ‘সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন’ এর আওতায় ফেলে দেওয়া!

 

কিছুদিন বাদে প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিজিওলজি নিয়ে পড়েছেন গৌতম, সাথে ভাই আর বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাস্তায় রাস্তায়। শুনছেন বেদেদের গান, আয়ত্ত্ব করছেন ট্রেনে সম্মিলিত তালে বেজে ওঠা ‘আরবান সিম্ফোনি’। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর গান আর কথা পরে ঠিকই স্থান পেয়েছে ব্যান্ডটির গানের খাতায়। কিন্তু রাজনীতির আকাশে যে কালো মেঘ থমকিয়ে ছিল, তা কিছুদিন পর টের পেয়েছিলেন তারা।

 

সময়টা ঠিক ষাটের শেষ, সত্তরের গোড়ায়। গৌতমের সাথে দেখা হয়েছিল অন্য দুই অশ্ব বিশু আর এব্রাহামের। বিটলস ভক্ত এই দুই টিন এজ কিছুদিনের মধ্যেই ভক্ত বনে যায় ‘মণিদা’র। এব্রাহামের হাতেখড়ি বেহালায়, আর বিশুর গিটারে। এদিকে তবলা ছেড়ে গৌতমের কাঁধে উঠেছে তখন গিটার। বিটলস, ডিলান, বিটোভেন, বায়েজ আর অন্যান্য পশ্চিমা সংগীতে মজেছেন, গড়ে তুলেছেন ‘আর্জ’ নামের একটি ব্যান্ড। ঝাঁকড়া বড় চুল আর ‘বিলিতি’ রকস্টার সাজে গৌতম ইংরেজি গান করলেও রাজনীতির প্রতি সূক্ষ্ম একটা টান অনুভব করছিলেন তখন থেকেই।

 

৬৮’তে নিক্সন বসলেন ক্ষমতায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। ভিয়েতনামে শুরু হল মার্কিন সৈন্যদের গণহত্যা। এদিকে কলকাতাজুড়ে তখন নকশাল আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বারুদ আকারে। চারু মজুমদারের বিপ্লবের ডাকে সাড়া দিয়েছিল কলকাতার কলেজপড়ুয়া অসংখ্য ছেলেমেয়ে।  হাতে ‘লালবই,’ আর চোখে আগুনরাঙ্গা বিপ্লবের স্বপ্ন- এক মোহময় রোমান্টিসিজম ফয়েলে মোড়ানো ছাত্ররা সেসময় কৃষকদের সাথে সম্মিলিত হয়েছিল ধনিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে। ট্রিংকার্স ক্লাব কিংবা মুলাঁরুশের আলো ঝলমলে সন্ধ্যা আর খ্যাতি ছুঁড়ে ফেলে ‘আর্জ’ ছেড়ে দিয়েছিলেন গৌতম, উপলব্ধি করেছিলেন ইংরেজি গান করে আসলে কোন কিছু বদলানো সম্ভব না। এই বারুদ সময়ে সামিল হলেন নকশাল রাজনীতিতে, বিই কলেজ পড়ুয়া প্রদীপও যোগ হলেন সাথে।

 

চলমান আন্দোলনের সময়টা নিঃসন্দেহে দাগ কেটে গিয়েছিল ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র সদস্যদের মাঝে। ৭০’ এ ঘরছাড়া গৌতম গান-বাজনা ভুলে চলে গেলেন আন্ডারগ্রাউন্ডে, মিশলেন আপামর কৃষক সমাজে, শুনলেন তাদের গান। মাঠে প্রান্তরে নবান্নের গান তাকে অনুপ্রাণিত করলো, আর এগুলোই পরে আফ্রো-আমেরিকান ব্লুজ হিসেবে জীবন পেয়েছে মহীনের গানে। এদিকে কংগ্রেস-পুলিশ মিলে পুরো কলকাতাজুড়ে চালাচ্ছে নকশালবাদীদের দমন। গৌতম একবার বাড়ি ফিরে গ্রেফতার হলেন পুলিশের হাতে। ‘এনকাউন্টারে’ ঠিক তার চোখের সামনেই পড়লো প্রিয় বন্ধুর রক্তাক্ত লাশ। সে এক ভীতিকর সময়।

 

দেড় বছর জেলে কাটিয়েছিলেন গৌতম, এদিকে প্রদীপ তখনও আন্দোলনে ব্যতিব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আশ্চর্যের বিষয় ছিল, জেলে থাকাকালীন সময় অস্থিরতা নিয়ে কোন গান লেখেননি গৌতম, তার লেখা সেসময়ের বেশির ভাগ গানই ছিল রোম্যান্টিক। পশ্চিমবঙ্গে ফেরত না যাওয়ার শর্তে জেল থেকে ছাড়া পেলেন গৌতম। নকশাল আন্দোলন নিয়ে চলছে তুমুল গণ্ডগোল, একদিকে আদর্শদ্বন্দে ভোগা কমিউনিস্ট, অন্যদিকে পুলিশ, সি-আর-পি, কংগ্রেস আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে স্তিমিত হয়ে আসতে থাকল আন্দোলন। রাজনীতি থেকে সরে এসে কাঁধে স্প্যানিশ গিটার ঝুলিয়ে মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভ হিসেবে ভোপাল পাড়ি জমালেন গৌতম। কলকাতায় পড়ে রইলেন প্রদীপ-রঞ্জন-ধূর্জটি। যদিও তাদের মাসতুতো ভাই ধূর্জটি মহীনের কোন গান শুনে যেতে পারেননি, প্রেম রহস্যের মায়াজালে আটকে আত্মহত্যা করেছিলেন ‘৭৪ সালে।

 

১৯৭৪ এলো। চাকরি-বাকরি ছেড়ে গৌতম ফিরে এলেন পুরোনো শহরতলী কলকাতামুখে। তখন গৌতম আর প্রদীপের বাসায় যাতায়াত ছিল এব্রাহাম, তপেশ, বিশু আর তাপসের। বাড়িতে কারোও কোন চাকরি নেই, তাই সবার প্রিয় ‘মণিদা’ বাড়ির নাম দিলেন ‘বেকার হাউজ’। সাতজোড়া চোখ তখন একই স্বপ্ন দেখছে- মিউজিক, রক মিউজিক! বাড়ির দেওয়ালে তিক্ততা মেশানো ‘আস্তাবল’ লেখাটাকে রীতিমত কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নিলেন গৌতম, বাড়িতে সংগীত চর্চা বন্ধ হবার পরিবর্তে বাড়লো তার মাত্রা। আস্তাবলের ঘোড়াগুলোর প্রস্তুতি পর্ব চলছে তখন।

 

প্রতিদিনই লেখা হচ্ছে নতুন গান, আর নতুন সুর।  ফ্রেজারগঞ্জে বন্ধুদের সাথে পিকনিকে খেলতে গিয়ে প্লাস্টারে ভাঙ্গা পা নিয়ে বিছানায় গৌতম পড়ে রইলেও ঠিকই তার প্লাস্টারের উপর ‘কলকাতা’ গানটি লিখে ফেলেন রঞ্জন। কিন্তু সবসময় ‘আস্তাবল’এ পড়ে রইলে তো আর রক মিউজিকটা করা হয়ে উঠবে না, তাই গৌতম সেরে উঠলে সাতজন মিলে শুরু করেন স্টেইজ শো।

 

বিপত্তিটা লাগলো নাম নিয়ে। সাতজন ভেবেই বোধহয় প্রথমে তারা শো করলেন ‘সপ্তর্ষী’ নামে। এসব ব্যাপারে অনেক বেখেয়ালী মানুষ গৌতম। এরকম এক শো’তে তাই নিজেদের পরিচয় করালেন ‘গৌতম চ্যাটার্জি বিএসসি অ্যান্ড সম্প্রদায়’ নামে। এসব নিয়ে ইয়ার্কি-ঠাট্টার অন্ত নেই। একদিন হঠাৎই সিরিয়াস হয়ে গেলেন রঞ্জন, জীবনানন্দের ‘সাতটি তারার তিমির’ বই থেকে বের করলেন ‘ঘোড়া’ কবিতাটি।

 

‘মণিদা, ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ রাখা যায়, কেমন হয়?’ রঞ্জন বললেন  

 

আর গৌতম ক্ষণিকেই হেসে বললেন, ‘এক্ষুনি ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।’

 

কুয়াশান্বিত জ্যোৎস্নায় তার বিলীয়মান দোলাচলে খুরশব্দহীন মহীনের ঘোড়াগুলি হ্রেষা ধ্বনি দিয়ে সেই থেকে এগিয়ে চলে পৃথিবীর প্রান্তরে।

 

(চলবে)

Tagged , , ,