মহীনের ঘোড়াগুলি : উত্থান থেকে বর্তমান (পর্ব ২)

(প্রথম পর্বের পর)

 

আস্তাবল ছেড়ে কার্তিকের ভরা জ্যোৎস্নার কাশ বন পেরিয়ে ঘোড়াগুলির হ্রেষা ধ্বনি পৌঁছেছিল গোধুলির আলো রাঙ্গা দূর পাহাড়ের গায়ে। বেদনা বিধুর রাডারে শব্দের প্রতিধ্বনি চৈত্র হলুদ এক বিকেলে চূর্ণফুল হয়ে ঝরে পড়েছিল ঘোড়াগুলির নিস্তেজ কাফনে। স্বপ্নবিভোর সাত ঘোড়া শ্রান্ত বেশে শূন্যতার রানওয়েতে দাঁড়িয়ে। ‘সপ্তর্ষি’র সে আসর, ক্যাফের আড্ডা, নিঝুম রাতে ড্রামস, গিটার আর কন্ট্রাবেইসের দাপাদাপি- ঘোড়ারা ক্ষান্ত হল অবশেষে, বাস্তবতার কাছে হার মেনে। ১৯৮১ সাল। জমজমাট সে কলকাতা, শহর ট্রাম-লরি-বাস আর বলিউডের পোস্টারে ঠাসা। সত্যজিৎ রায় ভারতবর্ষ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সিনেমা ব্যক্তিত্ব, সাথে ঋত্বিকেরও নাম-ডাক হয়েছে বেশ। চাকরির বাজারে মন্দা, ইন্টারভিউ’র লাইনে দাঁড়িয়ে কঙ্কালসার হয়ে ঘরে ফেরে একদল ঘর্মাক্ত যুবক। চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হয়ে তখন ক্ষমতায় ইন্দিরা গান্ধী। এমন এক সময়ে ঘোড়াদের প্রস্থান চোখে পড়েনি কারোরই, পড়ার কোন কারণও ছিল না।

 

ব্যান্ড হিসেবে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ সে সময় তথাকথিত ‘শিল্পী’র তকমা পায়নি। তাদের বলা হত ‘ক্ষ্যাপাটে উন্মাদ’! আর উন্মাদের গান কেউ শোনে নাকি আবার?! মণিদারা প্রতিবেশির গালমন্দটাকে কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু বাস্তবতার দৈনিক চপেটাঘাতে মিউজিকের নেশাটাকে দমাতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। যদিও দমিত ‘উন্মাদের গান’গুলো ঠিকই একদিন ফিনিক্স হয়ে ফিরেছিল ‘প্রজন্মের গান’ হয়ে- তবে সে পরের আলাপ।

 

যে সময়টায় মহীনের শুরু, পৃথিবীর ঠিক অপর পাশটায় ক্লাসিক রক অ্যান্ড রোলের বিবর্তন হচ্ছে ক্রমশঃ। ৭০ এর শুরুতে ছন্নছাড়া হল বিটলস, ঘোড়াদের জন্য যারা ছিল প্রকাণ্ড এক ইনফ্লুয়েন্স। ‘রাবার সোউল’ আর ‘সার্জেন্ট পেপার লোনলি হার্টস ক্লাব ব্যান্ড’ অ্যালবাম দু’টো ছিল চমকে ঠাসা! নেই কোন আপবিট টেম্পোর ছোঁয়া, টালমাটাল টাইম সিগনেচার আর গিটারের অ্যাবসার্ড কাজ। ফলে  বিটলসের ভক্তকূলের নিদারুণ প্রসার ঘটেছিল ক্রমেই, যারা ক্লাসিক রকের মাঝে খুঁজতেন ভিন্ন স্বাদ। আর পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘পাইপার অ্যাট দ্য গেইটস অফ ডন’ এ তারা খুঁজে পেলেন সাক্ষাৎ সঙ্গীতের এল ডোরাডো, রক প্রবেশ করল তার সবচেয়ে আনকনভেনশনাল জনরার জগতে- সাইকাডেলিয়া

 

সত্তরের পর সাইকাডেলিক রকের টর্চ বিয়ারার হয়ে উঠেছিল পিঙ্ক ফ্লয়েড। ‘সোর্সফুল অফ সিক্রেটস’ এর পর এলো ‘মেডলে’, ‘দ্য ওয়াল’ আর ‘ডার্ক সাইড অফ দ্য মুন’ এর মত ভয়ঙ্কর সব অ্যালবাম। থেমে নেই রোলিং স্টোনসও, তাদের গানেও চলছে আজব সব এক্সপেরিমেন্ট! রকের সাথে ধীরে ধীরে মিশলো স্যাক্সো, অরগান, কয়্যার মিউজিক- এমনকি সিতারের মত ইন্সট্রুমেন্ট! ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে ওয়েস্টার্ন মিউজিক মন ভরে আত্মস্থ করেছিলেন গৌতম, রঞ্জন, প্রদীপ, তাপস, তপেস, এব্রাহাম আর বিশু, বাদ ছিলনা শ্যোঁপা, বাখ, বিটোফেন কিংবা মোৎজার্ট। কলকাতার অলি-গলিতে চষে যে সিম্ফনিটা তারা রপ্ত করেছিলেন, নিজেদের গানে এসে সবকিছু একসাথে জোট বাঁধলো যেন- ওয়েস্টার্ন রক-সাইকাডেলিয়া আর কলকাতার আরবান সিম্ফোনির এক সুররিয়াল মিশেল। জ্যাজ, ফোক, সাইকাডেলিক, আরবান রক- সবকিছুকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসলে একে বলা যেতে পারে ভারতীয় আভা গার্দ।

 

মহীনদের রেকর্ডের প্রথম গান ‘হায় ভালোবাসি’ পরিচয় করায় ঘোড়াদের আর্টিস্ট্রির সাথে, তাদের দর্শন, ভালোবাসা আর হতাশার সাথে। জীবনানন্দের সাতটি তারার তিমিরের ঘোড়াগুলোর পোস্টমডার্নিটির সরাসরি এক্সপ্রেশন এই গান। স্প্যানিশ চিত্রকর পিকাসো আর ফিল্মমেকার বুনুয়েল বলুন কিংবা ইতালিয় কবি দান্তে আলিয়েগ্রি; কিংবা বিটলস, ডিলান আর বিটোফেনের নাম নেওয়ার সংগত কারণ কি? উত্তর- তারা যে যুগে অবস্থান করেছেন; তাদের শৈল্পিক আর্টিস্ট্রির এক্সপ্রেশন ছিল উৎপাদক (এখানে শিল্পী হিসেবে বোঝানো হয়েছে) আর ভোক্তার (শিল্পের দর্শক যারা) এর তথাকথিত সম্পর্কের তীব্র সমালোচনা। শিল্পী তাদের ভক্ত অনুরাগীর চাহিদার খাতিরে নিজেদের দর্শন এবং প্যাশনকে জলাঞ্জলি দিয়ে শিল্পকর্মের চর্চা করবেন- এমন মতাদর্শের ধার কখনোও ধারেন নি এই মানুষগুলো। আভা গার্দ মুভমেন্টের পরিধিটা ছিল বিশাল- সিনেমা, গান থেকে শুরু করে রাজনীতি, চিত্রকর্ম, কবিতা প্রায় সব আঙ্গিকেই এর চর্চা হচ্ছিল, বিশেষ করে ষাটের দশক এর শুরু থেকে। সমসাময়িক মেইনস্ট্রিমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কখনই ছাড়তো না অল্টারনেটিভ আভা গার্দ মুভমেন্ট।

 

ভারতের প্রথম স্বাধীন রক ব্যান্ড- যাদের পূর্বে নেই কোন ইলেক্ট্রিক মিউজিকের মাতামাতি, এলিট পাড়াগুলোতে শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে শুরু করে হেমন্ত, লতা, মান্না, সলীলের সমাহার আর তল্লাটগুলো বলিউড-টালিউড সঙ্গীতের দৌরাত্ম্য- সেসময়ে যাত্রা পর্ব শুরু করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। ৭৫’ এ পর্নশ্রী ক্লাবে প্রথম শো, তারপর থেকে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ ছুটলো তুমুল বেগে। রাত-দিনভর রিহার্সাল আর গিটার, অরগ্যান, ভায়োলিনে নতুন গানের সুতো বোনা। বিটোফেনের ট্রায়ো অফ ভায়োলিন শুনতে শুনতে একদিন গৌতম, এব্রাহাম আর প্রদীপের হাত ধরে জন্ম নিল ‘হায় ভালোবাসি’র অসামান্য স্ট্রিং অর্কেস্ট্রাল প্রিলিউড। সাথে ‘মেরুন সন্ধ্যালোক’, ‘ভেসে আসে কলকাতা’ আর ‘সংবিঘ্ন পাখিকূল’ নিয়ে ৭৭’ বেরোল তাদের প্রথম অ্যালবাম সংবিঘ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক

 

আবারও ফিরে তাকাই ‘হায় ভালোবাসি’র চিত্রপটে। গানটা চারপাশের পৃথিবী নিয়ে ব্যান্ডের সদস্যদের কল্পনা প্রসূত এক আনপ্যারালাল স্কেচবুক। আরবান ফোক রকে যেখানে মিশেছে অরগ্যান, ভায়োলিন আর ইলেক্ট্রিক গিটারের অর্কেস্ট্রাল এক সংমিশ্রন। ব্যান্ডের সদস্যরা তাদের মস্তিষ্কের খোরাক জুগিয়েছেন মাঠে প্রান্তরে ঘুরে, ক্ষেত-খামারের চাষা কিংবা গন্তব্যহীন বেদে-কাবুলিওয়ালাদের সাথে মিশে। লাইনগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ-

 

‘যখন দেখি ওরা কাজ করে গ্রামে-বন্দরে

শুধুই ফসল ফলায়, ঘাম ঝরায় মাঠে-প্রান্তরে,

তখন, ভালো লাগে না, লাগে না কোন কিছুই

সুদিন; কাছে এসো, ভালোবাসি এ সব কিছুই’

 

‘হায় ভালোবাসি’ ঘোড়াদের শৌখিন ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি, একই সাথে কৃষক কিংবা শ্রমিকের মত সাবঅল্টার্ন জনগোষ্ঠীর সাথে যে আত্মিক টান তাদের রয়েছে, লাইনগুলো সেটার অকাট্য স্বীকারোক্তি।

 

মহীনের গানজুড়ে রয়েছে কলকাতা নিয়ে ঘোড়াদের ফ্যাসিনেশন, অবসেশন আর ফ্রাস্ট্রেশান। কুয়াশা তুলিতে আঁকা কলকাতার ভেসে আসা সাইরেন শোনায় গৌতমের কর্কশ গিটারের আউট্রো- গৌতম যেন এক ক্ষ্যাপাটে জিম মরিসন ‘কলকাতা’ গানে। আকাশে থমকে থাকা মেঘের আড়ালে লুকানো পাখিদের বিষণ্নতার চিত্রপটের দেখা মেলে ‘সংবিঘ্ন পাখিকূল’এ। আগাছার জঞ্জালে মোড়া শূণ্যতা নিয়ে লেখা গান মনে করায় ঋত্বিকের সুবর্ণরেখার দৃশ্য- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত রানওয়েতে শৈশবের সীতা খেলতে যায় যেখানে।

 

গৌতমকে সবসময়েই ধরা হতো ঘোড়াদের সর্দার, কিন্তু স্টেইজে কিংবা অ্যালবামে তার প্রমাণ মিলতো সামান্যই। তিন অ্যালবামের আটটি গানের মধ্যে গেয়েছেন শুধুমাত্র একটি গানই, কিন্তু গানটিতে লুকিয়ে আছে ব্যান্ডের সুবিশাল পরিসর, যা কলকাতার আরবানিটি ছাড়িয়ে পৌঁছেছিল নির্জন এক সাঁওতাল পাড়ায়। উদাস এক ব্যক্তির ‘মেরুন সন্ধ্যালোক’ যাপন যেখানে ক্লাইম্যাক্টিক হয়ে ওঠে সাঁওতালি গানে, বিষণ্ন সুর পালটে হঠাৎই মনে দোলা দেওয়া এক শিমুলিয়া সুর-

 

‘জো জো দারু রে সিতা জুবা কা না সিতা জুবা কা না
সিতা হুঁ কাঁই কাঁই জুবা হুঁ জাঁই জাঁই
দুলাংগাতি জো জো জোমকে’

 

অর্থ জানা নেই। কিন্তু গান আর সুর রক্তে দোলা দেয়। এই গান মহীনের সুররিয়াল অ্যাবসার্ডিটির আইডেন্টিটি।

 

সাইকেডেলিক আর আরবান সিম্ফোনির এক্সপেরিমেন্টে ঠাঁসা এই অ্যালবাম বেরিয়েছিল গাঁথানি রেকর্ডস থেকে। তবে অ্যালবাম করার মত যথেষ্ট টাকা-কড়ির ঝনঝনি সে বেলা ছিল না বললেই চলে। শেষ রক্ষা ছিল তাদের এক শুভাকাঙ্খী বান্ধবী সঙ্গীতার থেকে টাকা ধারদেনা করে, যিনি কিনা পরবর্তীতে হয়েছিলেন রঞ্জন ঘোষালের সহধর্মিণী।

 

ঘোড়াদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটা ছিল স্টেইজে। কিন্তু শো মিলতো কদাচিৎ। তবে সেই আমলেও ঘোড়ার দল সাড়া ফেলে দিয়েছিল রবীন্দ্রসদনে মস্ত একটা শো করে। তিন পর্বের শোতে প্রথম ভাগে ছিল অ্যাকোস্টিক ইনস্ট্রুমেন্ট, সঙ্গে বাউল-সুফি-ভাটিয়ালির মেডলে। দ্বিতীয় ভাগে ছিল পুরনো বাংলা গান। অখিলবন্ধু ঘোষের গান থেকে শুরু করে শচীন দেববর্মণ- সকলের গানই গাওয়া হয়েছিল সেই পর্বে। আর তৃতীয় পর্বে ইলেকট্রিক রক। সঙ্গে কিছু বাউল এবং জ্যাজ়। দড়ি আর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল স্টেজ ক্রাফট। ছোটবেলা থেকে জড়ো করা বেদের গান, বাউলসঙ্গ, মাঠের গান ঢুকে পড়েছিল আর্বান আধুনিক গান এবং তার পরিবেশনায়। প্রদীপ তার স্মৃতিকথায় বলেছিলেন-

 

‘স্টেইজ ক্রাফটেই মাতিয়ে দেওয়া গিয়েছিল দর্শককে। স্টেইজে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘বাঁশের ট্র্যাপিজ’।সেসব ঝুলতে ঝুলতে পারফর্ম করেছিলাম আমরা। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। হলফ করে বলতে পারি, কলকাতা এর আগে বা পরে অমন শো আর কখনো দেখে নি’

 

কিন্তু সবকিছুর ভিড়ে এক্সেপ্টেন্স নিয়ে একটা স্ট্রাগল চলছিল সবসময়। এমন বৈপ্লবিক বাংলা রক এক্সপেরিমেন্ট কলকাতার সে জেনারেশন হজম করতে পারেনি। কলকাতার ‘দূরদর্শন’এ ডাক পড়েছিল একবার ঘোড়াদের। ইন্সট্রুমেন্ট বিহীন সে স্টুডিওতে বিচিত্র খিস্তি খেউড় শুনতে হয়েছিল তাদের, অভিযোগ- ‘এগুলো কোন গান হলো নাকি!’ প্রথম অ্যালবাম বেরোনোর পর অবশ্য আনন্দবাজারে প্রশংসাসূচক কড়চা লিখেছিলেন কলামিস্ট শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। সে সুবাদে পরবর্তীতে দূরদর্শনে পারফর্ম করেছিল মহীন।তবে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ এসে জুটেছিল পঞ্চাশের দশকের আলোড়ন তোলা কবি দীপক মজুমদারের কাছ থেকে, যিনি ছিলেন ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক। তার লেখায় মহীনের গান শোনার এক উদাত্ত আহবান-

 

ঘোড়াগুলির স্বাস্থ্য ভালো, গলা খারাপ নয়, হাত তো চমৎকার মুষ্টিবদ্ধ।প্রসঙ্গতঃ এদের একটি রেকর্ড আছে, নামঃ সংবিগ্ন পাখিকুল ও কলকাতা বিষয়ক। পাঠক যথাশীঘ্রসম্ভব কিনুন, ঠকবেন না, একটা অভিজ্ঞতা হবে অন্যধরণের বাংলা গান শোনার।”

 

৭৮’ এ হিন্দুস্থান রেকর্ডস বের করলো ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব’। প্রথম অ্যালবামের চাইতে এই অ্যালবামে এক্সপেরিমেন্টেশন ছাড়িয়ে গেল মহাকাশকেও! মহীনের সুরে কলকাতার ভৌতিক কেরানীর মেসে তারা নামিয়ে এনেছিলেন জীবন্ত ফ্লাইং সসারকে। সত্যজিৎ এর ‘বঙ্কু বাবুর ডায়রি’ গল্পের প্রভাব এখানে চোখে পড়ার মত, কিন্তু গান আর সুরে মহীনের ধারায় নিজস্বতা অস্বীকার করার উপায় নেই। রঞ্জনের লিরিকে এক ধরণের বিদ্বেষ কাজ করেছে সে সময়ের কর্পোরেট ব্যাঙ্ক অফিসার আর কর্পোরেশনের প্রতি, আর গিটার-ভায়োলিনে অনবদ্য কাজ দেখিয়েছেন গৌতম-এব্রাহাম-প্রদীপ। অ্যালবামের অন্য গান ‘শোনো শুধীজন’ ঘোড়াদের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিধ্বনি। স্যাক্সো আর ইলেক্ট্রিক সিম্ফোনিক রিদমের কোরাসে সমাজ অধিপতীদের সাবধানী সংকেত শুনিয়ে যায় এ গান।

 

‘হাংরি জেনারেশন’ এর মতই মহীনের প্রতিকূলে দাঁড়িয়েছিল অসংখ্য বাধা, যার প্রমাণ মিলত তাদের কাছে আসা অসংখ্য অভিযোগপত্রে। শিল্পীমহল থেকে শুরু করে শ্রোতারা যাচ্ছেতাই গালমন্দ লিখে পাঠাচ্ছিলেন। রঞ্জনের ভাষায় এ ‘আঁতেল’ শ্রেণীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও ছিল তাদের, রঞ্জন একে একে সব অভিযোগ জমিয়ে বানিয়েছিলেন তাদের দ্বিতীয় রেকর্ডের কাভার। শিশুতোষ মনে হলেও রঞ্জন এ ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ সিরিয়াস। এদিকে রবীন্দ্র সদন ছাড়াও কলকাতা আন্তর্জাতিক জ্যাজ উৎসবের মতো পনেরো-বিশটি অনুষ্ঠান করেছিলেন তারা। যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি, স্টার ভবন, ম্যাক্স মুলার ভবনের সে অনুষ্ঠান অবশ্য ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। আর তাদের টিকিটগুলোও ছিল দারুণ আকর্ষণীয়, ব্যান্ড সদস্যদের বুড়াঙ্গুলের ছাপ দিয়ে বানানো সে পাসগুলো দেখাতো ডাকটিকিটের মত।

 

৭৯’ সালে যখন ভারতী রেকর্ডস থেকে ‘দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি’ প্রকাশিত হল, ব্যান্ডের কোন অশ্বই চিন্তা করেননি এটি হতে চলেছে তাদের শেষ অ্যালবাম। রেকর্ডের দু’টি গান অর্থে এবং সুরে দুই বিপরীত মেরুর। ‘এই সুরে বহুদূরে’ গানটিকে বলা যেতে মহীনের সব থেকে ‘হ্যাপিয়েস্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’, যেখানে আছে সুরে সুরে নতুন আশার বাণী। আবার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘চৈত্রের কাফন’, গৌতমের নকশাল জীবনের বিভীষিকার দুঃস্বপ্নের ক্যানভাস আঁকা গানের কথায়। নিজের চোখের সামনে ফেইক এনকাউন্টারে যে বন্ধু মারা গিয়েছিলেন, তার স্মৃতি বেধনাবিধুর এক আবহ তৈরি করে গানের সাইকেডেলিয়া আচ্ছন্ন ফ্ল্যামেঙ্কো।

 

এই ‘চৈত্রের কাফন’এ এসেই যেন শেষ পেরেকটা লেগেছিল অশ্বদের আস্তাবলে। হাসি-ঠাট্টার মগ্ন সাত তরুণের ভালোবাসা আর বিদ্রোহের মন্ত্রে যে গান ও সুর সৃষ্টি হয়েছিল, তাদের চোখের সামনেই সেগুলো নষ্ট হয়েছিল রেকর্ড প্রোডিউসার আর শ্রোতামহলের হাতে। ৮১’ তে অ্যালবামের বিক্রি নেই। ঘুড়ি ওড়ানো কুয়াশা-তুলির কলকাতার আকাশ তখন ঘোড়াদের জন্য থমথমে মেঘময়। নিওলিথ মহেঞ্জোদারোর প্রান্তর পেরিয়ে আসা ক্লান্ত ঘোড়ারা চৈত্রের হলুদ বিকালে বিদায় নেয় একে অপরের কাছ থেকে, রানওয়ের বিষণ্ন শূণ্যতাই তখন শুধু পড়ে থাকে।

 

বিদায় নিলেও ঘোড়ারা একদিন ফিরেছিল বন বাদাড় ঘুরে এসে, আবার ঠিক বছর কুড়ি পরে…

 

(চলবে)

 

প্রথম পর্বের লিঙ্কঃ https://grumpyfish.shop/mohinerghoraguli/

Tagged , , ,